সোমবার, ১৪ মার্চ, ২০১১

জামায়াত বা জামায়াত নেতারা কি আসলেই যুদ্ধাপরাধী?

যুদ্ধাপরাধের কথিত বিচার নিয়ে সরকার লেজে-গোবরে দশায় পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সরকারের মন্ত্রীদের উল্টা-পাল্টা কথা, উল্টা-পাল্টা সিদ্ধান্ত, ট্রাইব্যুনাল, তদন্ত কমিটি ও প্রসিকিউশনের হাস্যকর তদন্ত, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সরকার বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধ এবং যুদ্ধকালীন সময়ে বিভিন্ন অপরাধের তদন্ত ও বিচার যে স্বাধীনতা উত্তরকালে একবার হয়ে গেছে, এই বিষয়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ার পর যুদ্ধাপরাধের বিচারের সরকারি নতুন উদ্যোগকে দেশের ভিতর ও বাইরে সবাই বিরোধী দল বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীকে দমনের একটা নীলনক্সা বলে মনে করতে শুরু করেছে। তাছাড়া যুদ্ধাপরাধের বিচার আইন নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি। কারণ ১৯৭৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম (ট্রাইব্যুনাল) এ্যাক্ট স্বাধীনতা-উত্তরকালে প্রণীত হয়েছিল শুধুমাত্র পাক বাহিনী ও তাদের সহযোগী সশস্ত্র বাহিনীর যুদ্ধাপরাধের বিচারের লক্ষ্যে। অন্যদিকে এই স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বাংলাদেশে অসামরিক ব্যক্তি যারা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে এবং মানুষের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধমূলক কাজে জড়িত হয়েছিল তাদের বিচারের জন্য কলাবরেটরস এ্যাকট বা দালাল আইন প্রণীত হয়েছিল। স্বাধীনতা-উত্তর স্বাধীনতা যুদ্ধের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে তিন বছর জনগণের কাছে এটা স্পষ্ট ছিল। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তখন পাক বাহিনীকেই উল্লেখ করা হতো। পরবর্তীকালেও এর অন্যথা দেখা যায়নি। কিন্তু ওয়ান ইলেভেনের স্থপতি এবং ভারতের সাথে হর্স ট্রেডিং-এর নায়ক মইন উ আহমদ ভারতীয় পরামর্শে স্বাধীনতার প্রায় ৪০ বছর পরে হঠাৎ করে বাংলাদেশে বাংলাদেশী যুদ্ধাপরাধী তৈরির কাজ শুরু করে। বাংলাদেশীদের মধ্যে যুদ্ধাপরাধী খোঁজার যে কান্ডজ্ঞানহীন কাজের কথা স্বাধীনতা-উত্তর সরকারের চিন্তাতেও আসেনি, পরবর্তীকালের সরকারও যে চিন্তা করেনি, এমনকি ৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় মেয়াদের সরকারও যে বিষয়ে একটি কথাও বলেনি, ওয়ান ইলেভেনের পর ভারতের সাথে হর্স ট্রেডার মইন-উ-আহমদ বাংলাদেশী জাতিকে বিভক্ত করার সুপরিকল্পিত নীল নকশা অনুযায়ী বাংলাদেশীদের মধ্যে যুদ্ধাপরাধী খোঁজার ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে দেয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার অগ্রপশ্চাৎ কোনো বিবেচনা ছাড়াই ভারতীয় এজেন্ডা গলধকরণ করে বাংলাদেশে এবং তার অসামরিক লোকদের মধ্যে যুদ্ধাপরাধী খোঁজার জোর কসরত শুরু করে দিয়েছে। ১৯৭৩ সালে প্রণীত পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আইনের এ অপব্যবহার এবং এ আইনের অধীনে বাংলাদেশের অসামরিক লোকদের মধ্যে যুদ্ধাপরাধী তৈরি জন্য তদন্ত কমিটি গঠন এবং মামলা পরিচালক ও বিচারক নিয়োগ- সবই দুনিয়ার ইতিহাসে নজিরবিহীন। পৃথিবীর কোথাও যেখানে যুদ্ধাপরাধের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ বছর পর যুদ্ধাপরাধ তদন্তের জন্য তদন্ত কমিটি হয়নি। বরং যুদ্ধের সময় বা যুদ্ধের পর পরই চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধকে সুনির্দিষ্ট করার জন্য তদন্ত কমিটি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়, তার তদন্ত যুদ্ধ শেষ হওয়ার তিন বছর আগেই ১৯৪২ সালে শুরু হয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ও যুদ্ধকালেই চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের চিহ্নিত এবং পরে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে তাদের শাস্তি দেয়া হয়। সার্বিয়ায় যে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয় তার নায়ক কারাদজিদরা যুদ্ধ চলাকালেই চিহ্নিত হয় পরে তদন্তের মাধ্যমে সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের মামলা চলে। রুয়ান্ডায় যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রেও এই ঘটনাই ঘটেছে। ভারতের ইচ্ছায় ব্যতিক্রম ঘটছে শুধু বাংলাদেশে। ১৯৭৩ সালে শুধুমাত্র পাক বাহিনীর যুদ্ধাপরাধ বিচারের জন্য যে আইন প্রণীত হয়েছিল, তার ভিত্তিতে পাক সেনাদের যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, যুদ্ধাপরাধী চিহ্নিত এবং ভারতীয় যোগসাজশে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা ও ছেড়ে দেয়ার পর সে অচল আইনকেই সচল করে তার অপপ্রয়োগের জন্য আজ উঠেপড়ে লাগা হয়েছে। এটা শুধু আইনের অপব্যবহারই নয়, দেশবাসীর বিরুদ্ধে এটা একটা ষড়যন্ত্র। দেশবাসীকে বিভক্ত, বিপর্যস্ত ও দুর্বল করার লক্ষ্যেই শত্রুদেশ ও শত্রু বাহিনীর যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে যে যুদ্ধাপরাধ আইন প্রণীত হয়েছিল, সেই আইনে দেশবাসীকে টার্গেট বানানো হয়েছে। ভারতীয় এ নীল নকশা শুধু আইনেরই অপপ্রয়োগ করছে না আইনকে বিকৃতও করেছে এবং যুদ্ধাপরাধীদের আওতা ও সংজ্ঞা পাল্টে দিয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে আন্তর্জাতিক বিধি অনুসারে পাকবাহিনী এবং তাদের সহযোগী সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যেই যুদ্ধাপরাধের তদন্ত করা হয় এবং পাক বাহিনীকেই যুদ্ধাপরাধের জন্য সার্বিকভাবে দায়ী করা হয়। ৭২ সাল থেকে তদানীন্তন বাংলাদেশ সরকারের কর্তৃপক্ষীয় মহলের বক্তব্য, বিবৃতি ঘোষণা যদি সামনে রাখা হয় তাহলে এই বিষয়টিই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানী কারাগার থেকে দেশে ফেরেন। ঐদিন বিকেলে রেসফোর্স (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে বিশাল সমাবেশে তিনি ঘোষণা করেন, ‘বিশ্বকে মানবাতিহাসের জঘন্যতম ঘটনার তদন্ত অবশ্যই করতে হবে। একটি আন্তর্জাতিক দল এ বর্বরতার তদন্ত করুক আমরা এটা কামনা করি। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বাংলাদেশে যে নির্বিচার গণহত্যা করেছে, তার অনুসন্ধান ও ব্যাপকতা নির্ধারণের জন্য আমি জাতিসংঘের নিকট একটা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠনের আবেদন জানাচ্ছি।' উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এই একবারই মাত্র আন্তর্জাতিক তদন্তের আহবান জানানো হয়েছিল। তারপর সরকারের কেউ আর দ্বিতীয়বার একথা উচ্চারণ করেনি। তবে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা অব্যাহতভাবে বলে যাওয়া হয়েছে। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং শপথ গ্রহণের পরই তিনি বলেন, ‘লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের কাহিনী আমি শুনেছি। তবুও বাংলার মানুষ এত নিচে নামবে না। বরং যা মানবিক তাই করবে। তবে অপরাধীদের আইনানুগ ব্যবস্থা করবে।' কিন্তু যুদ্ধাপরাধের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করার আগে কলাবরেটর বা দালালদের ব্যাপারে শেখ মুজিব সরকার প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালের ১৬ জানুয়ারি প্রকাশিত সরকারি এক প্রেসনোটে বলা হয়, ‘সরকার দালাল বা এ ধরনের অপরাধীদের দেখা পেলে তাদের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রেখে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অসামরিক পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে।' এর আট দিনের মাথায় ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি দালালদের দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়। পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি পেছনে পড়ে যাচ্ছে মনে করেই সম্ভবত ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ শহীদদের পরিবারবর্গের পক্ষ থেকে পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ঢাকার রাজপথে মিছিল বের হয়। মিছিল পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করে। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান জাতির উদ্দেশে দেয়া বেতার ও টিভি ভাষণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গটি আবার সামনে নিয়ে আসেন। পাক প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানে আটকে পড়া পাঁচলাখ বাঙ্গালীকে ফেরত দেয়ার বিষয়টি পাক যুদ্ধবন্ধীদের মুক্তির সঙ্গে শর্তযুক্ত করায় শেখ মুজিবুর রহমান এ ভাষণে বলেন, ‘তাদেরকে (পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙ্গালী) ফিরিয়ে দেয়া হোক। এ ইস্যুকে কোনোক্রমে যুদ্ধবন্দীদের সমপর্যায়ে ভাবা চলবে না। কারণ তাদের (পাক যুদ্ধবন্ধীদের) মধ্যে এমন অনেক আছেন যারা শতাব্দীর নৃশংসতম হত্যার অপরাধে অপরাধী। তারা মানবিকতাকে লঙ্ঘন করেছে এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালার ভিত্তিতে বিচার হবে।' এ বছরই ১৬ মে শেখ মুজিবের আওয়ামী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে পাক হানাদার বাহিনীর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্দেশ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্ডিন্যান্স প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলছে।' ইতোমধ্যে কলাবরেটের আইনের অধীনে কলাবরেটর-দালালদের বিচারের কাজ শুরু হয়ে গেছে। এ আইনের অধীনে প্রায় ১লাখ লোককে আটক করা হয়। এদের মধ্যে থেকে অভিযোগ আনা সম্ভব হয় ৩৭৪৭১ জনের বিরুদ্ধে। বাকীদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ না থাকায় ছেড়ে দেয়া হয়। অভিযুক্ত ৩৭৪৭১ জনের মধ্যে থেকে দালালীর কোন প্রকার প্রমাণ না পাওয়ায় ৩৪৬২৩ জনের বিরুদ্ধে কোন মামলাই দায়ের করা সম্ভব হয়নি। বাকী যে ২৮৪৮ জনের বিচার হয় তাদের মধ্যে বিচারে মাত্র ৭৫২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমানিত হয়। বাকী ২০৯৬জন বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। যে ৭৫২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমানিত হয় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগও গুরুদন্ড দেয়ার মত ছিল না। শুধুমাত্র চিকন আলী নামের একজনের ফাঁসির আদেশ হয়। ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর শেখ মুজিব কর্তৃক যখন সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা আসে তখন একমাত্র চিকন আলী ছাড়া সকলেই মুক্ত নাগরিক হিসেবে বেরিয়ে আসে। সেই চিকন আলীও দন্ড বাস্তবায়ন হওয়ার আগেই মারা যান (তথ্য সুত্রঃ একাত্তরের ঘাতক দালালরা কে কোথায়? প্রকাশক মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র)। ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর আটককৃত সবাইকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা পর্যন্ত যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় এবং যাদেরকে ছেড়ে দেয়া তারা কেউই জামায়াতের লোক ছিলনা। এরমানে জামায়াতের কোন লোকের বিরুদ্ধে কেউই কোন প্রকার দালালীর বা নির্যাতনের অভিযোগ দায়ের করেনি। এমনকি ঐসময়ের ক্ষমতাশীল আওয়ামীলীগ সরকারও জামায়াতের কোন নেতা বা কর্মীর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আনেননি। ৭২ সালের ২রা জুলাই কুষ্টিয়ার এক জনসভায় তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, ‘পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।' এ বছরেরই ২৯ আগস্ট আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে বলেন, ‘সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের সম্পর্কিত তদন্তের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা প্রকাশ করা হবে।' এরপর ১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল প্রকাশিত বাংলাদেশ সরকারের এক প্রেস রিলিজে বলা হয়, তদন্তের মাধ্যমে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর মধ্য থেকে ১৯৫ জনকে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, জেনোভা কনভেনশনের আর্টিকেল তিন এর লঙ্ঘন, হত্যা, ধর্ষণ, লুটের অপরাধে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৯৭৩ সালের ১ জুনের এক খবরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে বলা হয়, ‘টোকিও ও নুরেমবার্গ বিচারের সময় যে মূল নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে একটি বিল পেশ করা হবে।' ৭৩ সালের ৮ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব এক সাক্ষাৎকারে জানান, ‘ইতিপূর্বে তালিকাভুক্ত পাক যুদ্ধাপরাধীদের সংখ্যা ১২০০ থেকে কমে ১৯৫ জন হয়েছে। এই ১৯৫ জন পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই।' কিন্তু পাক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অবশেষে হয়নি। ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল নয়াদিল্লীতে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রি-পক্ষীয় চুক্তি অনুসারে পাক যুদ্ধাপরাধীদের forget and forgive এর অংশ হিসেবে ক্ষমা ও ছেড়ে দেয়া হয়। এইভাবে পাক যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেয়ার ছয় মাস একুশ দিন পর ১৯৭৩ সালের ৩০ নবেম্বর বাংলদেশের ভেতরের যারা রাজনৈতিকভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, যারা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় খুন, ধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ছাড়া অন্যান্য ছোট-খাট অপরাধ করেছিল, তাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে বলেন, ‘অতীতের সমস্ত গ্লানি ভুলিয়া গিয়া পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য আমরা কোনো উদ্যোগ বাদ দেইনি এবং সর্বশেষ ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে ক্ষমা ঘোষণা করিয়া আমরা চূড়ান্ত অবদান রাখিয়াছি। ঐ সকল যুদ্ধবন্দি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধসহ মারাত্মক অপরাধ করিয়াছে। ইহা হইতেছে নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও উপমহাদেশে ভবিষ্যৎ শান্তি ও স্থায়িত্ব গড়িয়া তোলার পথে আমাদের অবদান।' অবশেষে ১৯৭৪ সালের শেষ মাস ১৫ ডিসেম্বর জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের প্রসঙ্গে আবারও বলেন, ‘পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের চেষ্টা আমরা করেছি, এমনকি মানবতা বিরোধী জঘন্য অপরাধের জন্য যাদের বিচার হওয়ার কথা ছিল সেসব যুদ্ধাপরাধীরও আমরা মার্জনা করে দিয়েছি। বাংলার মানুষের বদান্যতা ও ঔদার্য ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।' স্বাধীনতা-উত্তর মুজিব সরকারের উপরোক্ত বক্তব্য, বিবৃতি ও ঘোষণায় এ কথা পরিষ্কার যে, ১৯৭৩ সালের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল এ্যাক্ট প্রণীত হয়েছিল শুধুই যুদ্ধাপরাধের (এর সাথে মানবতা বিরোধী ধারাও যুক্ত) বিচারের জন্য এবং এ যুদ্ধাপরাধীরা ছিল পাক সেনাবাহিনীর সদস্য। আর অপরাধমূলক কাজের সাথে যুক্ত বাংলাদেশীদের বিচারের জন্যে করা হয়েছিল দালাল আইন। কিন্তু এখন শত্রু বাহিনীর যুদ্ধাপরাধীদের জন্যে প্রণীত ১৯৭৩ সালের আইনকে স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর বাংলাদেশের অসামরিক ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে প্রয়োগের সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ করা হয়েছে। যে আইনটি একটি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেয়া এবং যুদ্ধাপরাধের জন্য দায়ী একটা বিদেশী বাহিনীর বিচারের জন্য প্রণীত হয়েছিল সেই আইনকে বাংলাদেশের অসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয় ১৯৭৩ সালের আইনটিকে আন্তর্জাতিক আইন ও বিধির তোয়াক্কা না করে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে করে যাকে ইচ্ছা তাকে অভিযুক্ত করে শাস্তি দেয়া যায়। অতএব এর মাধ্যমে একদিকে ১৯৭৩ সালের আইনের অপব্যবহার করা হচ্ছে, অন্যদিকে এ কালাকানুনকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি ও ব্যক্তিকে দমনের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে। এই বিষয়গুলোকে সামনে রেখে বলা যায়, এ আইনটির প্রয়োগ যেমন বৈধ নয়, তেমনি আইনটিও জঘন্য একটি কালাকানুন, যার উদ্দেশ্য যথেচ্ছভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা।তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে যুদ্ধাপরাধ ইস্যুটি মইন-উ-আহমদের মাধ্যমে ভারতই সৃষ্টি করেছে। তাদের উদ্দেশ্য আরও ভয়াবহ। তারা এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কার্যকর ইসলামী শক্তিকে নির্মূল করতে চায়। যাতে করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার শক্তি দুর্বল হয়। ভারত মনে করে, ভারতের লক্ষ্য হাসিলের পথে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা হলো মুসলিম জাতিসত্তার অতন্দ্র প্রহরী ইসলামী শক্তি, যারা জীবনের বিনিময়ে হলেও বাংলাদেশের স্বতন্ত্র রাষ্ট্রসত্তাকে রক্ষা করতে চায়। সংগঠিত ইসলামী শক্তির মধ্যে জামায়াতে ইসলামী অগ্রগণ্য বলেই জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রধান টার্গেট। আমাদের আইন প্রতিমন্ত্রী যখন বলেন, গোটা জামায়াতে ইসলামী যুদ্ধাপরাধী, তখন বোঝা যায় জামায়াতের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্বেষ কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে। এই বিদ্বেষ ১৯৭১ সালের জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার কারণে সৃষ্টি হয়নি অবশ্যই। কারণ ১৯৭১ সালে জামায়াত ছিল একটি ক্ষুদ্র দল। জামায়াতের তুলনায় মুসলিম লীগ ছিল শতগুণে বড় দল। যেহেতু জামায়াত ছোট দল ছিল সেহেতু ১৯৭১ সালে তাদের ভূমিকাও খুবই নগণ্য ছিল। শান্তি কমিটি, রাজাকার ইত্যাদি সংগঠন ও বাহিনীর তালিকা দেখলে বোঝা যাবে জামায়াতের উপস্থিতি সেখানে নেই বললেই চলে। তাহলে জামায়াতে ইসলামীকে যুদ্ধাপরাধী সাজাবার সীমাহীন বিদ্বেষ ও মহা আয়োজন কেন? উত্তর একটাই সেটা হলো, ভারতের এটাই ইচ্ছা। ভারতীয় বিশ্লেষকরা, ভারতীয় সাংবাদিকরা, ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা জামায়াতের বিরুদ্ধে অবিরাম বিষোদগার করে আসছে। অথচ বাংলাদেশের একটি ছোট দল হিসেবে জামায়াতের বিরুদ্ধে ভারতের এ বিষোদগারের কোনো হেতু নেই। হেতু থাকলে সেটা এটাই যে, জামায়াত বাংলাদেশে মুসলিম জাতিসত্তার উজ্জীবন ও রক্ষায় বিশ্বাসী। কারণ জামায়াত নিশ্চিত বিশ্বাস করে বাংলাদেশের মানুষের মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবোধ যতদিন থাকবে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র রাষ্ট্রকাঠামোর যৌক্তিকতা ততদিন জীবন্ত ও অজেয় থাকবে। জামায়াতের এই বিশ্বাস ভারতের জনগণ নয় ভারতের এক শ্রেণীর শাসকদের চক্ষুশূল। এসব বিবেচনা সামনে রেখে অভিজ্ঞ মহলের অভিমত এই যে, যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে যারা বাংলাদেশের জনগণকে বিভক্ত করে দুর্বল ও অসহায় করে তুলতে চাচ্ছে, তাদের মুখোশ অচিরেই খুলে যাবে। যুদ্ধাপরাধ শব্দের অপব্যবহার করা, যুদ্ধাপরাধ আইনের অপপ্রয়োগ করা, যুদ্ধাপরাধ আইনকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের কালাকানুনে পরিণত করা, এসবের পিছনে বাইরে থেকে যারা কলকাঠি নাড়ছে তাদের বদ মতলব সবই মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু নানা রাখঢাক করে, নানা শোরগোল তুলে একশ্রেণীর মিডিয়াকে বশংবদ বানিয়ে সরকার এই সত্যগুলোকে আড়াল করতে চাচ্ছে। কিন্তু সত্য তার আপন শক্তিতেই মানুষের সামনে এসে যাবে। ইতোমধ্যেই তার লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন