সোমবার, ১৪ মার্চ, ২০১১

কাবাগৃহের শ্রেষ্ঠত্ব ও নির্মান ইতিহাস - ২

রাসুলুল্লাহ (সাঃ)একবার হযরত আয়শা (রাঃ)কে বলেন, আমার ইচ্ছা হয়, কাবা গৃহের বর্তমান নির্মান ভেঙ্গে দিয়ে ইব্রারাহীমী নির্মানের অনুরুপ করে দেই। কিন্ত কাবা গৃহ ভেঙ্গে দিলে নও মুসলিম অজ্ঞ লোকদের মনে ভুল বোঝাবুঝি দেখা দেওয়ার আশঙ্খার কথা চিন্তা করেই বর্তমান অবস্থা বহাল রাখছি। এ কথাবার্তার কিছুদিন পরই মহানবী (সাঃ) দুনিয়া থেকে বিদায় গৃহন করেন।
দ্বিতীয় পর্ব শুরু নিচ থেকে সহজে বুঝার সুবিধার্থে প্রথম পর্বের শেষ অংশটুকু উপরে তুলে ধরেছি:

হযরত আয়শা (রাঃ) আনহার ভাগ্নেয় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) মহানবী (সাঃ) এর উপরোক্ত ইচ্ছা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। খোলাফায়ে রাশেদীনের পর যখন মক্কার উপর তার কর্তৃত্ব প্রতিস্ঠিত হয়, তখন তিনি উপরোক্ত ইচ্ছাটি কার্যে পরিনত করেন এবং কা'বা গৃহের নির্মাণ ইবরাহীমী নির্মাণের অনুরুপ করে দেন। কিন্তু মক্কার উপর তার কর্তৃত্ব বেশীদিন স্থায়ী হয়নি।অত্যাচারী হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ মক্কায় সৈন্যাভিযান করে তাকে শহীদ করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে। ক্ষমতা দখল করেই সে আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়রের এ চিরস্মরনীয় কীর্তিটিও মুছে ফেলতে মনস্থ করে। সে মতে সে জনগনের মধ্যে প্রচার করতে থাকে যে, আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়রের এ কাজ ঠিক হয়নি। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কাবা গৃহকে যে অবস্থায় রেখে গেছেন, সে অবস্থায় রাখাই আমাদের কর্তব্য। এ অজুহাতে কা'বা গৃহকে আবার ভেঙ্গে জাহেলিয়াত আমলের কোরাইশারা যে ভাবে নির্মাণ করেছিল সেভাবেই নির্মাণ করা হলো। হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের পর কোন কোন বাদশাহ উল্লেখিত হাদিস দৃস্টে কা'বা গৃহকে ভেঙ্গে হাদিস অনুযায়ী নির্মাণ করার ইচ্ছা করেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন ইমাম হযরত মালেক ইবনে আনাস (রাঃ) ফতোয়া দেন যে, এভাবে কা'বা গৃহের ভাঙ্গা গড়া অব্যাহত থাকলে পরবর্তি বাদশাহদের জন্য একটি খারাপ দৃস্টান্ত স্থাপিত হয়ে যাবে এবং কা'বা গৃহ তাদের একটি খেলনায় পরিনত হবে। কাজেই বর্তমানে যে অবস্থায় রয়েছে সে অবস্থায়ই থাকতে দেওয়া উচিত। সমগ্র মুসলিম সমাজ তার এ ফতোয়া গ্রহন করে নেয়। ফলে আজ পর্যন্ত হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের নির্মাণই অবশিষ্ট রয়েছে। তবে মেরামতের প্রয়োজনে ছোটখাট কাজ সব সময়ই অব্যাহত থাকে। এসব রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, খানায়ে কা'বা জগতের সর্বপ্রথম গৃহ এবং কমপক্ষে সর্বপ্রথম উপাসনালয়। কোরআনে এ যেখানে আল্লাহর আদেশে হযরত ইবরাহীম ও ইসমাইল কর্তৃক কা'বা গৃহ নির্মিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেখানে একথাও বর্ণিত রয়েছে যে, তারা কাবাগৃহের প্রাথমিক ভিত নির্মাণ করেননি, বরং সাবেক ভিত্তির উপরই নির্মাণ করেন।



A Persian miniature painting depicting Kaaba and pilgrims, 17th century; Adilnor's Collection.
কা'বা গৃহের ভিত্তি পূর্ব থেকেই বিদ্যমান ছিল। সূরা হজ্জের এক আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ বলেন, যখন আমি ইবরাহীমের জন্যে এ গৃহের স্থান ঠিক করে দিলাম। এতেও বুঝা যায় যে, কাবা গৃহের স্থান পূর্ব থেকে নির্ধারিত ছিল। কোন কোন রেওয়াতে আছে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে কাবা গৃহ নির্মাণের আদেশ দেয়া হলে ফেরেশতার মাধ্যমে বালুর স্তুপের নীচে লুক্কায়িত সাবেক ভিত্তি চিহ্নিত করে দেয়া হয়। মোট কথা এ আয়াত দ্বারা কাবা গৃহের একটি শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানিত হলো যে, এ হচ্ছে জগতের সর্বপ্রথম গৃহ অথবা সর্বপ্রথম উপাসনালয়।সূরা ইবরাহীমে বর্ণিত আছে, বায়তুল্লাহ শরীফের ভিত্তি হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর পূর্বে স্থাপিত হয়েছিল। ইমাম কুরতুবী সূরা বাক্কারার তফসীরে বিভিন্ন রেওয়াতের সাহায্যে প্রমান করেছেন যে, সর্বপ্রথম হযরত আদম (আঃ) বাহতুল্লাহ নির্মাণ করেন। তাকে যখন পৃথিবীতে নামানো হয়, তখন মু'জেযা হিসাবে সরন্দ্বীপ পাহাড় থেকে এখানে পৌছানো হয় এবং জিবরাইল (আঃ) বায়তুল্লাহর জায়গা চিহ্নিত করে দেন। আদম (আঃ) নিজে এবং তার সন্তানেরা এর চারদিক প্রদক্ষিন করতেন। শেষ পর্যন্ত নুহের মহাপ্রাবনের সময় বায়তুল্লাহ উঠিয়ে নেয়া হয়; কিন্তু তার ভিত্তি সেখানেই থেকে যায়। হযরত ইবরাহীম (আঃ) কে এই ভিত্তির উপরই বায়তুল্লাহ পুনঃনির্মাণের আদেশ দেয়া হয়। হযরত জিবরাঈল প্রাচীন ভিত্তি দেখিয়ে দেন। ইবরাহীম (আঃ) নির্মিত এই প্রাচীর মুর্খতা যুগে বিধ্বস্ত হয়ে গেলে কুরাইশারা তা নতুন ভাবে নির্মাণ করে। এ নির্মাণকাজে আবু তালেবের সাথে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ও নবুওয়াতের পূর্বে অংশ গ্রহন করেন। এখনো অধিক সৌন্দর্য বর্ধন এবং আর্কষনীয় করার জন্য নির্মাণ কাজ অব্যাহত আছে। এটি যেমন চিরকাল সন্মানিত, তেমনি চিরকাল শক্রুর কবল থেকে সুরক্ষিত।



১৮৮০ সালের কা'বা।

বুখারী ও মুসলিম হাদিসে আছে, হযরত আবু যর (রাঃ) হজুর (সাঃ) কে একবার জিজ্ঞেস করেন যে, জগতের সর্বপ্রথম মসজিদ কোনটি? উত্তর হলো, মসজিদে হারাম। আবার প্রশ্ন করা হলো, এরপর কোনটি ? উত্তর হলো মসজিদে বায়তুল মুকাদ্দাস। আবার জিজ্ঞেস করলেন, এই দুটি মসজিদ নির্মাণের মাঝখানে কতদিনের ব্যবধান ছিল ? উত্তর হলো চল্লিশ বছর।এ হাদিসে হযরত ইবরাহীম (আঃ) হাতে কাবাগৃহের পুনঃনির্মানের দিক দিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মানের ব্যবধান বর্ণনা করা হয়েছে। কেননা বিভিন্ন হাদিস থেকে প্রামানিত রয়েছে যে, বায়তুল মুকাদ্দাসের প্রথম নির্মাণও হযরত ইবরাহীমের হাতে কাবাগৃহ নির্মাণের চল্লিশ বছর পর সম্পন্ন হয়। এরপর হযরত সুলায়মান (আঃ) বায়তুল মুকাদ্দাসের পুনঃনির্মান করেন। এভাবে বিভিন্ন হাদীসের পরস্পর বিরোধীতা দুর হয়ে যায়।

হাজরে আসওয়াত (কালো পাথর)


চলবে..............।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন