সোমবার, ১৪ মার্চ, ২০১১

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, ধারাবাহিক-৬

৪. ধর্মনিরপেক্ষ শাসনের পরিণামঃ শাসন শক্তি এমন এক হাতিয়ার যা দ্বারা জনসাধারণ শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগও পেতে পারে আবার চরমভাবে নির্যাতিতও হতে পারে। যে কোন রাষ্ট্রব্যবস্থায় শাসকগণই রাষ্ট্রের সকল ধন-সম্পদের উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আইন রচনা দ্বারা তারা নাগরিকদের সমগ্র জীবনের উপরই প্রচন্ড প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম । তাদের পরিচালিত বিচার পদ্ধতির উপরই সর্বসাধারণের মান ইজ্জত সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। শিক্ষা-ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতির ভবিষ্যৎ মন মগজ গঠন করার চাবিকাঠিও তাদের হাতে ন্যস্ত। বিশেষভাবে আধুনিক যুগে নাগরিকদের গোটা জীবনের সুখ-দুঃখ মান-অপমান উন্নতি অবনিত রাষ্ট্র পরিচালক ও শাসকবৃন্দের ইচ্ছা মনোবৃত্তি ও দৃষ্টিভঙ্গীর উপর অনেকখানি নির্ভর করে।  এমতাবস্থায় শাসক সম্প্রদায় আল্লাহর দাসত্ব ও ধর্মের বন্ধন থেকে যদি মুক্ত হয়, বিশ্ব স্রষ্টার নিকট যদি জবাবদিহিতার অনুভূতি শূন্য হয় এবং আখিরাতে পুরস্কার ও শাস্তির প্রতি যদি অবিশ্বাসী হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে তারা সুবিধাবাদী নীতি অনুসরণ করে চলবে। তাদের চরিত্র কিছুতেই নির্ভরযোগ্য হবে না। তারা নিজেদের পার্থিব লাভ-ক্ষতির ভিত্তিতে সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। ক্ষমতা রক্ষার জন্য তারা যে কোন পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত হবে। আত্ম-প্রতিষ্ঠার জন্য এবং নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্য তারা শাসনযন্ত্রকে যথেচ্ছ ব্যবহার করবে। তাদের গোটা চরিত্র মানুষের খিদমতের জন্য নিয়োজিত না হয়ে নিজেদের খিদমতেই নিযুক্ত হবে। শুধু গণ-বিপ্লব এড়াবার জন্য এবং জনসমর্থন থেকে বঞ্চিত হবার ভয়েই তারা জনসেবা করবে। এখানেও চরম উদ্দেশ্য আপন স্বার্থ ।  আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস যাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করে তাদের শাসন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীর শাসনে যে বিরাট পার্থক্য আছে তা যেমন যুক্তিসম্মত, তেমনি তা ঐতিহাসিক সত্য। যারা ধর্মকে বাস্তবজীবনে গ্রহণ করেছে তাদের শাসন ধর্মহীনদের শাসন থেকে স্বাভাবিকভাবেই আলাদা ধরনের হবে। এমনকি মুসলিম শাসনের দীর্ঘ ইতিহাসেও ধার্মিক এবং অধার্মিক শাসকদের যুগে জনগণের জীবনে ব্যাপক পার্থক্য দেখা গেছে। শাসন ব্যক্তিই সমাজের সর্বাপেক্ষা ব্যাপক ও সবল শক্তি। এ বিপুল শক্তিকে একমাত্র আল্লাহ ও আখিরাতের ভয়, আল্লাহ ও রাসূলের আইন এবং ধর্মীয় অনুশাসন দ্বারাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তদুপরি জনমতও আংশিকভাবে শাসন শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ শাসকদের আচরণ একমাত্র জনমত দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। ফলে তারা প্রচারযন্ত্রের সাহায্যে এবং ক্ষমতার যাদুমন্ত্রে জনমতকে কলুষিত করে অনেক সময়ই অন্যায়কে ন্যায় বলে চালিয়ে দিতে পারে। তাই ধর্মনিরপেক্ষ শাসন জনগণকে ধোঁকা দিয়ে ক্ষমতায় থাকার সাধনাই করে।  ৫. ধর্মীয় পরিণামঃ মানব সমাজের সকল বিভাগ থেকে বেদখল করে যে সত্তাকে ধর্মীয় উপসনালয়ে বন্দী করা হয় তার পক্ষে নিজের অস্তিত্বটুকু পর্যন্ত বজায় রাখাও সম্ভব নয়। এরূপ দুর্বল কোন সত্তার প্রতি মানুষের অবহেলা অত্যন্ত স্বাভাবিক। জীবনের অগণিত সমস্যায় জর্জরিত মানুষ যখন মুক্তির সন্ধানে সর্বক্ষণ অস্থির তখন তাকে বাস্তব কোন সমাধান না দেখিয়ে শুধু পরকালের ভয় দেখালে কি হবে? যে ভগবান আমাকে দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা সংকুল অবস্থা থেকে মুক্তির পথ দেখায় না, সে শুধু মন্দিরে বসে আমার নিকট পূজা দাবী করলে আমি তাকে ভালবাসব কেন? যে গড (God) সারা সপ্তাহে আমাকে সমস্যা সংকুল বিশ্বে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে নিশ্চিন্তে সুখনিদ্রা উপভোগ করে, সে কোন অধিকারে শুধু রোববার গীর্জায় আমার আনুগত্য দাবী করে? এরূপ নিষ্কর্মা স্বার্থপর ও অনাবশ্যক সত্তার অস্তিত্বই যদি কেউ অস্বীকার করে তাহলে তাকে কোন যুক্তিতে দোষী সাব্যস্ত করা যায়?  এমন কোন খোদাকে মানবার জন্য যারা মানুষকে আহবান জানায় তারাই বাস্তবক্ষেত্রে খোদার স্থান দখল করে এবং অথর্ব ও বোবা খোদার পক্ষ থেকে ধর্মীয় সেবা হিসাবে নিজেরাই বিধান দান করে। জীবনের সর্বক্ষেত্রের উপযোগী সামঞ্জস্যপূর্ণ কোন বিধান রচনা করার ক্ষমতা মানুষের নেই বলেই ঐসব ধর্মীয় নেতাদের রচিত অনুশাসন মানুষের প্রতি ইনসাফ করতে সক্ষম হয় না। ফলে রাজনৈতিক কায়েম স্বার্থের প্রতি ধর্মীয় সমর্থন যোগান দিয়ে বৃহত্তর মানব সমাজের উপর যুলুম করার উপায় হিসাবে খোদাকে ব্যবহার করা হয়। তখন এরূপ যালিম খোদাকে অস্বীকার করা ছাড়া মানুষের আর কোন পথই থাকে না।  ইউরোপে খ্রিস্টান ধর্মনেতাদের সমর্থনে যে জঘন্য পুঁজিবাদ জনসাধারণকে এক শ্রেণীর লোকের অর্থনৈতিক দাসত্বের নিগড়ে আবদ্ধ করে রেখেছিল তার বিরুদ্ধে কার্ল মার্কস যখন আওয়াজ তোলেন তখন গীর্জার সেই মানব সৃষ্ট ধর্মের দোহাই তুলেই এর প্রতিরোধ করা হয়। নির্যাতিত জনতাকে ধর্মের নামে আপন মুক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেখে কার্ল মার্কস ঘোষণা করলেন যে, ধর্ম এক প্রকার আফিম যা মানুষকে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য করে ছাড়ে। তখন ধর্মীয় নেতারা ধর্মের একমাত্র অবলম্বন হিসাবে তাদের ঐ দুর্বল খোদার দোহাই দিল। এবার মার্কস ঘোষনা করলেন যে, খোদাই মানুষের সেরা দুশমন।  কার্ল মার্সের মতবাদ মানব জীবনের জন্য সামগ্রিক বিধান দেয় না বলেই তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং একমাত্র অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মানব সমস্যাকে অধ্যয়ন করার ফলে তার রচিত সমাধান মানুষকে মুক্তি দিতে সক্ষম হয়নি। তিনি অর্থনৈতিক স্বাধীনতার নামে মানুষকে মানুষের পূর্ণ দাস হওয়ার অকৃত্রিম পথই প্রদর্শন করেছেন। কিন্তু তিনি ধর্ম ও খোদার বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন তা খ্রিস্টান পাদ্রীদের কৃত্রিম ধর্মেরই প্রতিক্রিয়া। খোদাকে জীবনের সকল ক্ষেত্র থেকে নির্বাসিত করে গীর্জায় আবদ্ধ করার পর তাকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যুলুমের সমর্থক হিসাবে পেশ করা ছাড়া জীবনে খোদার প্রয়োজনইবা কি থাকতে পারে? তাই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বাস্তব ক্ষেত্রে নাস্তিকতার দিকে মানুষকে ধাবিত করে। নাস্তিকতা প্রকৃতপক্ষে ধর্মনিরপেক্ষতারই স্বাভাবিক পরিণাম। ধর্মনিরপেক্ষতা খোদার প্রাথমিক পশ্চাদপসরণ, আর নাস্তিকতা তার চূড়ান্ত পরাজয়। তাই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ চরম অধর্মের পথ এবং ধর্মের চরম দুশমন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন